ডায়াগনস্টিক সেন্টার আর ভুয়া রিপোর্ট একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ

0
70
ডায়াগনস্টিক সেন্টার আর ভুয়া রিপোর্ট একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ


সাহাদাৎ রানা
চিকিৎসা মানুষের পাঁচটি মৌলিক অধিকারের মধ্যে অন্যতম একটি। মানুষের বাঁচা-মরার প্রশ্নটি এখানে সরাসরি জড়িত। এ নিয়ে অবহেলা উদাসীনতা বঞ্চনা প্রতারণা প্রত্যাশিত নয়।
স¤প্রতি রাজধানীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কয়েকটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অভিযান চালিয়ে ভুয়া রিপোর্ট উদ্ধার করেছে। যারা কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে রোগীদের রিপোর্ট দিয়ে আসছে। শুধু রাজধানীতে নয়, সারাদেশের প্রায় অধিকাংশ ডায়ানস্টিক সেন্টারের চিত্র একই, যাদের বিরুদ্ধে রয়েছে ভুয়া রিপোর্ট দেয়ার বিস্তর অভিযোগ। শুধু অলিতে গতিতে গজিয়ে উঠা ডায়াগনস্টিক সেন্টার নয়, শঙ্কার বিষয় হলো নামকরা অনেক ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধেও এমন অভিযোগ রয়েছে। কয়েক বছর ধরে সারাদেশে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে বহু ডায়াগনস্টিক সেন্টার। যাদের নেই টেকনোলজিস্ট, নেই রোগ পরীক্ষার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিও। অথচ তারাই দিচ্ছে রিপোর্ট। এ ক্ষেত্রে দায় রয়েছে চিকিৎসকদের। অধিকাংশ চিকিৎসক শুধু কমিশনের প্রাপ্তির জন্য রোগীদের বাধ্য করেন এসব ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে। অনেক ডাক্তার শুধু কমিশন প্রাপ্তির জন্য অপ্রয়োজনে দেন পরীক্ষা-নিরীক্ষাও। অথচ, চিকিৎসা একটি মহান পেশা। আর চিকিৎসকরা সব সময় সবার কাছে বিশেষ কিছু। বিশেষ করে রোগীদের কাছে যেন ভিন্ন গ্রহের মানুষ। সব সময়ই তাই চিকিৎসকদের দেখা হয় বিশেষ মানুষ হিসেবে। তবে সেই জায়গা থেকে মানুষ ধীরে ধীরে সরে আসছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে। বর্তমানে আমাদের দেশে চিকিৎসার বিষয়টি আর সেবাবান্ধব বলে কিছুই নেই। হয়ে গেছে পুরোপুরি ব্যবসানির্ভর। বর্তমানে করোনাকালে যা আবারও নতুন করে আমাদের সামনে এসেছে। বিশ্বের অন্য অনেক দেশে যখন করোনার মতো এমন কঠিন সময়ে চিকিৎসা বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট সবাই সর্তক সেখানে আমাদের চিত্র ভিন্ন। করোনাকে পুঁজি করে শুরু থেকে এক শ্রেণির মানুষ টাকা অপার্জনের উপায় খুঁজছেন। প্রতারণা করছেন সাধারণ মানুষের সঙ্গে। যা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
প্রতারণার ক্ষেত্রে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো সবচেয়ে এগিয়ে। বাইরে চাকচিক্য থাকলেও ভেতরের অবস্থা এ ক্ষেত্রে ভয়াবহ। বর্তমান প্রেক্ষাপট মানে করোনার বিষয়ে দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে আমাদের এখানে শুরু থেকেই করোনা চিকিৎসা দেয়ার ক্ষেত্রে বেশকিছু বেসরকারি হাসপাতাল ছিল উদাসীন। পরে অবশ্য সরকারের চাপে পড়ে কিছু বেসরকারি হাসপাতাল করোনা চিকিৎসায় নিজেদের যুক্ত করে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে কিছু নিয়মনীতি দেয়া হলেও বেসরকারি হাসপাতালগুলো কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা করছে না। বিশেষ করে কয়েক মাস আগে উত্তরার রিজেন্ট হাসপাতালের করোনা সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশিত হওয়ার পর মানুষকে এ বিষয়ে শঙ্কিত করে তুলেছিল। যেখানে করোনা টেস্ট না করে রিপোর্ট দেয়া হয়েছে রোগীদের। যা সারাদেশে ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো করে যাচ্ছে নিয়মিত। রিজেন্ট হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার পরও তাদের শিক্ষা হয়নি।
এখন প্রশ্ন হলো, সারাদেশে কতগুলো হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে এমনটা করা হচ্ছে? এর সহজ-সরল উত্তর অধিকাংশ। শুধু তাই নয়, শঙ্কার বিষয় হলো রিজেন্ট হাসপাতালের অনিয়মের তথ্য বেরিয়ে আসার পর বেরিয়ে এসেছে আরও অনেক তথ্য। যা এতদিন অনেকের কাছেই ছিল অজানা। এখানে আরও উদ্বেগের খবর হলো- স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যেসব বেসরকারি হাসপাতাল ও ল্যাবকে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও সেবা প্রদানের অনুমতি দিয়েছে এসব অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের নেই লাইসেন্স নবায়ন। অন্য অনেক বিভাগের লাইসেন্স নবায়নের বিষয়টি না জানা থাকলেও স্বাস্থ্য বিভাগ জানবে না এটা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ স্বাস্থ্য বিভাগের যাচাই-বাছাইয়ের পরই অনুমোদনের সিদ্ধান্ত দেয়া হয়। এখন প্রশ্ন হলো, তাহলে কারা যাচাই-বাছাই করল। কোন প্রক্রিয়ায় করা হলো। নিশ্চয় সেখানে কোনো ফাঁক রয়েছে। এটা সত্য এ ক্ষেত্রে কিছু অসাধু কর্মকর্তার সঙ্গে জোগসাজশে পরীক্ষা করার অনুমোদন নিয়েছে কিছু হাসপাতাল। এখানে দুঃখজনক তথ্য হলো অনেক হাসপাতাল ‘পিসিআর’ পরীক্ষার অনুমোদন নিয়ে রাখলেও এজন্য প্রয়োজনীয় মেশিন ও সরঞ্জাম নেই তাদের। মেশিন ও সরঞ্জাম না থাকলেও অজানা ক্ষমতার প্রভাবে এসব বেসরকারি হাসপাতালগুলো অনুমোদন পেয়েছে করোনা পরীক্ষার। আর এ সুযোগে পরীক্ষার নামে সেই অসাধু চক্র রোগীদের কাছ থেকে নিয়ে নিচ্ছে মোটা অঙ্কের অর্থ। হাজার হাজার ভুয়া করোনা রিপোর্টের তথ্যই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণপত্র। স¤প্রতি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ভুয়া রিপোর্টের বিষয়টিকে আবারও নতুন করে সামনে নিয়ে এলো।
অথচ নিয়ম হলো কোন বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে অনুমোদন দেয়া হলে সবার আগে দেখতে হয় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোয় রোগীর সেবা দেয়ার জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা রয়েছে কি না। কিন্তু এ ক্ষেত্রে এমন নিয়ম মানা হয় না। কিছু অসাধু কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশের এসব করা হয়েছে। আমাদের দেশের বাস্তবতায় মানুষ সরকারি হাসপাতালের ভোগান্তির কথা ভেবে বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার মুখী হন। সবার বিশ্বাস টাকা বেশি লাগলেও ভালো সেবা পাওয়া যাবে বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। কিন্তু স¤প্রতি রাজধানীর উত্তরায় রিজেন্ট হাসপাতাল করোনা পরীক্ষার ভয়াবহ জালিয়াতির পর ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ভুয়ার রিপোর্ট তথ্য সবাইকে হতবাক করে দিয়েছে। পাশাপাশি বিশ্বাসের জায়গায়ও বড় রকমের ধাক্কা লেগেছে। বিশেষ করে করোনাকালীন এমন সময়ে এমন খবর সবার মনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা তৈরি করেছে। শুধু করোনা রোগী নয়, অন্য সাধারণ রোগী নিয়েও স্বজনদের ভয় কমেনি। বরং আরও বেড়েছে। আমাদের দেশে অবশ্য বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের বিষয়ে অনেক অভিযোগ রয়েছে অনেক আগে থেকেই। তারপরও মানুষ সরকারি হাসপাতালের অবহেলার কারণে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে যায়। কিন্তু উত্তরার রিজেন্ট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ভুয়া রিপোর্টের তথ্য সবার সামনে প্রকাশিত হওয়ায় সবাই এখন নড়েচড়ে বসেছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো সারাদেশে এমন অসংখ্য রিজেন্ট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে যারা দিনের পর দিন ভুয়া রিপোর্ট দিয়ে যাচ্ছেন। যাদের প্রধান কাজ হলো মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করা। যাদের রয়েছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। ক্ষমতার প্রভাব। আর সাধারণ মানুষ কোনো উপায় না দেখে বাধ্য হয়ে এসব প্রতিষ্ঠানে যান।
এবার একটু পরিসংখ্যানের দিকে দৃষ্টি দেয়া যাক। পরিসংখ্যান বলছে বর্তমানে সারাদেশে প্রায় ১৭ হাজারের বেশি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে। এমন পরিসংখ্যানের তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের। যার অনুমোদন দিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। এখানে শঙ্কার তথ্য হলো অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের লাইসেন্স নবায়ন নেই। প্রতি বছর বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের লাইসেন্স নবায়ন করা বাধ্যতামূলক হলেও দেশের অর্ধেকের বেশি লাইসেন্স নবায়ন করা হয় না। কিছু করা হয় অবৈধ উপায়ে। আর বাকিগুলো লাইসেন্স ছাড়াই চলতে থাকে বছরের পর বছর। আর এসব কাজগুলো করেন কিছু অসাধু কর্মকর্তা। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে সারা বছরই স্বাস্থ্য বিভাগের দুর্নীতির কথা যেন সবার কাছে স্বাভাবিক ঘটনা। তবে সবার প্রত্যাশা ছিল করোনাকালীন সেই দুর্নীতি কমে আসবে। কিন্তু কমেনি। বরং করোনাকে পুঁজি করে এক শ্রেণির মানুষ প্রতারণার পরিমাণ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো আইন ও নিয়মনীতি না মেনে নিজের ইচ্ছে মতো যাইচ্ছেতাই করছে। মাঝে মাঝে এদের বিরুদ্ধে কিছু অভিযান পরিচালিত হয় সত্যি। কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের এ ধরনের কর্মকাÐ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এমন কর্মকাÐ বড় ধরনের অপরাধও। এর দায় স্বাস্থ্য বিভাগ কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। এখন যারা এসব কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িত তাদের খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। এখন সরকারের উচিত বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া। যা করতে হবে অতি দ্রম্নত। যেন সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ধারণা জন্মে- যে কেউ অন্যায় করলে পার পাবে না। আর সারা বছর বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে হবে।
চিকিৎসা মানুষের পাঁচটি মৌলিক অধিকারের মধ্যে অন্যতম একটি। মানুষের বাঁচা-মরার প্রশ্নটি এখানে সরাসরি জড়িত। এ নিয়ে অবহেলা উদাসীনতা বঞ্চনা প্রতারণা প্রত্যাশিত নয়।
আর সেই অধিকার আমাদের দেশের সংবিধান তার নাগরিকদের দিয়েছে। তাই বিশ্বের সব দেশের মতো আমাদের দেশেও চিকিৎসার বিষয়টি সব সময় আলাদা গুরুত্ব দেয়া হয়। কিন্তু বিগত তিন দশক ধরে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার বেহাল অবস্থার কারণ রোগীদের বিদেশনির্ভরতা অনেক বেড়েছে। প্রতি বছর অতিরিক্ত টাকা খরচ করে কয়েক লাখ মানুষ শুধু চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান। এতে দেশের টাকা যেমন বাইরে চলে যাচ্ছে তেমনি সুনাম নষ্ট হচ্ছে। তবে বাস্তবতা হলো চিকিৎসা ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি কম নয়। দিন দিন উন্নতি করছে। কিন্তু ভয়াবহ অনিয়মের খবর যখন সামনে চলে আসে তখন মানুষ বেশি শঙ্কিত হয়ে উঠে। এখন সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা।

সাহাদাৎ রানা : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন!
এখানে আপনার নাম লিখুন