মেজর সিনহা হত্যা ও ক্রসফায়ারের গ্রহণযোগ্যতা

0
88
মেজর সিনহা হত্যা ও ক্রসফায়ারের গ্রহণযোগ্যতা

গোপাল অধিকারী
কক্সবাজারের টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুর পুলিশ তল্লাশিচৌকিতে ৩১ জুলাই রাতে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান (৩৬)। গত ৩১ জুলাই টেকনাফের বাহারছড়া পুলিশ চেকপোস্টে সাবেক সেনা কর্মকর্তা সিনহাকে পুলিশ গুলি করে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ এনে পুলিশের ৯ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা করেন সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস। আদালতে ৯ আসামির মধ্যে ৭ জন আত্মসমর্পণ করেন। এ ঘটনার বিচার চেয়ে বুধবার কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাটি করেন নিহত ব্যক্তির বড় বোন শারমিন। আদালতের বিচারক তামান্না ফারাহ মামলাটি গ্রহণ করেন। তিনি এজাহারটি মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করে সাত দিনের মধ্যে আদালতকে অবহিত করতে টেকনাফ থানার ওসিকে নির্দেশ দেন।
গত ২৯ জুলাই ওমান প্রবাসী জাফর আমলকে পটিয়ার ভাইয়ার দীঘি থেকে গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে যায় চকরিয়ার থানার ওসি ও এসআই । পরে তাকে ইয়াবা ব্যবসায়ী বলে অভিযুক্ত করে তার স্ত্রীকে মুঠোফোনে ৫০ লাখ টাকা দাবি করেন। বলা হয় টাকা না দিলে ক্রসফায়ার দেয়া হবে। পরে ৩১ জুলাই পরিবার জানতে পারে জাফর ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় নিহতের মামা বাদী হয়ে পটিয়ায় জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে মামলা করেন। আদালত সিআইডিকে মামলাটি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। দোষীদের শাস্তির দাবি জানান স্বজনসহ এলাকাবাসী। প্রতিবেদন দুইটি অবশ্যই প্রশংসনীয় নয়। সাধারণ জনগণ যেখানে নিজেদের নিরাপদস্থল বলে মনে করে, রাষ্ট্র যেখানে জনগণের নিরাপত্তার জন্য আদর্শ বাহিনী হিসেবে সম্মান ও সম্মানী দিচ্ছে সেখানে পুলিশের এমন প্রতিবেদন কোন ভাবেই কাম্য নয়। কিন্তু এমন কিছু ঘটনায় “পুলিশ জনতা, জনতাই পুলিশ” এই শ্লোগানকে বিকৃত করছে। এই সকল প্রতিবেদনের জন্য পুলিশের সকল অর্জনকে ¤øান করে দিচ্ছে। তবে এমন পরিসংখ্যান নতুন নয়। বাংলাদেশে একটা সংস্কৃতি দাঁড়িয়ে গেছে বিচার বহির্ভূত হত্যা। বাংলাদেশে বিচার বহির্ভূত হত্যার নতুন ধারার সূচনা হয় এ শতকের প্রথম দিকে বিএনপি সরকারের সময়। ২০০২ সালে ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’ নামের অভিযানে অনেকে বিচার বহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন। এরপর র‌্যাাব প্রতিষ্ঠার পর কথিত ক্রসফায়ারে নিহত হন বহু মানুষ। মানবাধিকার সংস্থা অধিকার’র তথ্যে বিএনপি সরকারের ২০০২-০৬ সালে মোট ১ হাজার ১৫৫ জন ব্যক্তি বিনা বিচার হত্যার শিকার হন। ২০০৭-০৮ এই দুই বছরে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে ৩৩৩ জন একইরকম হত্যাকান্ডের শিকার। আর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের টানা তৃতীয় মেয়াদের এ পর্যন্ত অন্তত আড়াই হাজার মানুষ বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন।
আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কথিত ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধে ২০১৬ সালে মোট ১৭৭ জন নিহত হয়েছেন। ২০১৭ সালে এই সংখ্যা কমে ১৪১ জনে নেমে আসে। এরপর থেকে গতি আবার বাড়তে শুরু করে৷ ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচন এবং মাদকবিরোধী অভিযান ক্রসফায়ারের নতুন প্রেক্ষাপট তৈরি করে৷ ২০১৮ সালে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় ৪২১ জন, যা আগের বছরের তুলনায় তিনগুণ বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাদের এক প্রতিবেদনে অবিলম্বে ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ বন্ধে সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছে। তাদের হিসাবে গত বছর বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূতভাবে মোট ৪৬৬ জনকে হত্যা করা হয়েছে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ঘোষিত ‘মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে’ গড়ে প্রতিদিন কমপক্ষে একজনের মৃত্যু হয়েছেঅ্যামনেস্টি বলছে, এসব ঘটনার যথাযথ তদন্ত না করে সরকার বন্দুকযুদ্ধ, ক্রসফায়ারকে উল্টো সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। পুলিশ এইসব ঘটনায় বানোয়াট প্রত্যক্ষদর্শী তৈরি করে তাদের কাছ থেকে মিথ্যা বিবৃতি আদায় করছে বলেও অভিযোগ সংস্থাটির৷ মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের তথ্যে গত প্রায় দুই দশকে বাংলাদেশে ৪ হাজারের বেশি মানুষ বিনা বিচারে হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যে চলতি বছরে এ পর্যন্ত ২০৭ জন ব্যক্তি বিনা বিচারে হত্যার শিকার হয়েছেন। পূর্বেই বলেছি ক্রসফায়ারের এমন প্রতিবেদন কারো কাম্য নয়। এমন ঘটনা বেকায়দায় ফেলে দেয় সরকারকে। সরকার জনগণের নিরাপত্তার জন্য পুলিশ বাহিনীকে দায়িত্ব দিয়েছে স্বাভাবিকভাবেই তাদের গ্রহণযোগ্যতা বা প্রয়োজনীয়তা সরকারকে দেখিয়ে চলতে হবে। পুলিশ যে অন্যায় করেছে তা প্রমাণ হলে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হবে। অন্যদিকে ক্ষমতার ্প্রধান উৎস জনগণের নিরাপত্তা বা জনগণের চাওয়া-পাওয়াও পূরণ করে চলতে হবে সরকারকে। কাউকে বিনা বিচারে হত্যা করলে তার সঠিক বিচার না পেলে জনগণেরও সরকারের প্রতি আস্থা কমে যাবে। সরকার তাহলে এখন কি করবে? সরকার জনগণের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই হয়ত ক্রসফায়ার সিদ্ধান্তকে বেছে নিয়েছিল। কিন্তু সেটা কি সঠিকভাবে হচ্ছে? প্রকৃত অপরাধীকে কি নির্মূল করা যাচ্ছে? সেই জায়গাতে মনে হয় দ্বিমত রয়েছে। আমার জানামতে অপরাধের ধরণ বিবেচনা করেই আইন তৈরি করা হয়। কারণ সমাজে যদি অপরাধ না থাকত তাহলে কিন্তু আইন-পুলিশ-প্রশাসন কিছুরই প্রয়োজন হতো না। ইতিহাসে জেনেছি একসময় মানুষ ছিল যাযাবর। তারা পাহাড়ের গুহায় বসবাস করত। ধীরে ধীরে প্রয়োজনের তাগিদেই ঘর-বাড়ি, আইন-কানুন ও গ্রামপ্রধান বা রাষ্ট্রপ্রধান সৃষ্টি হয়েছে। ক্রসফায়ারের আগের অপরাধের ধরণে আমরা দেখেছি মাদকব্যবসায়ী, অস্ত্র ব্যবসায়ী ও ডাকাতরা নিজেদের বাঁচাতে পুলিশের উপর গুলিবর্ষণ করেছে। মূলত পুলিশের আত্মরক্ষার তাগিদেই গুলিছোড়া বা ক্রসফায়ারের প্রয়োজন এেেসছে। কিন্তু ধীরে ধীরে দেখা যাচ্ছে যে, পুলিশ তাদের অপরাধ ঢাকতেও এই ইস্যুটিকে ব্যবহার করছে। পৃথিবীর সকল কিছুই নিয়মমাফিক চললে কিন্তু সেই বিষয় নিয়ে বিতর্ক হয় না। কিন্তু যখনই সেইটার অপব্যবহার হয় তখনই কিন্তু সংশোধন, সংযোজন বা বিয়োজনের প্রয়োজন হয়। ঠিক একই বিবেচনায় ক্রসফায়ারের গ্রহনযোগ্যতা কিন্তু হারিয়েছে। হয় ক্রসফায়ার নিষিদ্ধ করতে হবে নতুবা এই আইনকে সংশোধন বা সংযোজন করতে হবে। স্বাভাবিকভাবেই সভ্য সমাজের একজন যদি ক্রসফায়ারে মারা যায় কেউ মেনে নেওয়ার কথা নয়। বিতর্ক তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক। তেমনই একটি বিতর্ক ট্যক অব দ্য ক্রান্টিতে পরিণত হয়েছে আর তা হলো সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খানকে হত্যা। পুলিশ বলছে মাদকের অভিযোগেই তাকে ক্রসফায়ার করেছে কিন্তু কয়েকটি গণমাধ্যমের অনুসন্ধানি প্রতিবেদনে ভিন্ন তথ্য এসেছে।
মূলত ইয়াবা নিয়ে ডকুমেন্টারি তৈরি করাতেই সেনাবাহিনীর মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানের প্রাণ গিয়েছে বলে জানা গেছে। ইউটিউবে ‘জাস্ট গো’ নামে একটি চ্যানেল খুলে তাতে কক্সবাজার এলাকার ইয়াবার আদ্যোপান্ত তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। টানা কয়েক দিন ইয়াবা বাণিজ্যের নেপথ্য কাহিনী নিয়ে ডকুমেন্টারিও তৈরি করছিলেন মেজর সিনহা। কোনো ধরনের ঝঞ্ঝা ছাড়াই সময় পার করছিলেন। তবে শেষ মুহূর্তে টেকনাফের ওসি প্রদীপ কুমার দাশের সাক্ষাৎকার রেকর্ড করাটাই কাল হয়ে দাঁড়ায় মেজর সিনহার জন্য। বর্তমান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সকলে সোচ্চার। কোন অপরাধ কিন্তু লুকানোর সুযোগ নেই। তারপরও যে গোপন হচ্ছে না তা কিন্তু নয়। তবে প্রত্যক্ষ ঘটনাগুলো চাঁপা দেওয়ার সুযোগ নেই। তারপরও কেন মানুষ ভুল করে, অপরাধ করলেও ধরা পরবে না ভাবে আমার বোধগম্য নয়। এছাড়াও আইন যেখানে সবার জন্য সমান সেখানে ফেসবুকে প্রদীপকে নিয়ে সাম্প্রদায়িকতা ছড়ানোও কতটা যুক্তিযুক্ত তাও আমার কাছে পরিষ্কার নয়। কারণ ওসি প্রদীপ যদি অপরাধ করে থাকেন তবে তার বিচার অবশ্যই করতে হবে। অপরাধীর কোন ধর্ম বা বর্ণ নেই। তাছাড়াও প্রদীপ শুধু একা নন তার সাথে রয়েছেন বড় কোন গডফাদার। আমি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একজন সচেতন মানুষ হিসেবে মনে করি, ক্রসফায়ার বা বিচার বর্হিভ’ত হত্যাকান্ড বন্ধ করা প্রয়োজন। কারণ এই আইনের প্রতি অপব্যবহার আইন ও বিচার দুটোর জন্য ক্ষতিকর। যারা এই পর্যন্ত বিচার বর্হিভ’ত হত্যার শিকার হয়েছেন তাদের বিষয়টি সরকারকে খতিয়ে দেখার অনুরোধ করব। কারণ সেই সমস্ত হত্যাযজ্ঞের বিচারই ক্রসফায়ারের বৈধ্যতা ফিরে দিতে পারবে। পূর্বে যদি কোন ব্যক্তির অপরাধমূলক একাধিক মামলা থাকে তাহলেই ক্রসফায়ার করা যেতে পারে এমন কোন বিষয় ভাবা যায় কি না তা ভেবে দেখার পরামর্শ রইল। টেকনাফের পুলিশের পটভ’মি সারাদেশের পুলিশকে বিতর্ক করছে ঠিক কিন্তু টেকনাফের দায় সবার উপর চাপানোর আমি ঘোড় বিরোধী। কারণ করোনাকালে পুলিশের অবদান চোখে পরার মত। আত্মীয়-স্বজন যেখানে জীবনের ঝুঁকি নেয় নি, মানবতা ও সামাজিকতা যেখানে মুখ থুবরে পরেছিল সেখানে পুলিশ বাহিনী ছিন্ন করেছে জীবনের মায়া। পুলিশবাহিনীই পারে অপরাধের মাত্রা নিমূর্ল করতে। করোনাকালের মানবিক পুলিশের ভূমিকা সবসময় দেখার প্রত্যাশায় রইলাম। সিনহা হত্যাসহ সকল বিচার বর্হিভূর্ত হত্যার সঠিক তদন্ত ও বিচার কামনা করছি।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন!
এখানে আপনার নাম লিখুন