স্মৃতি পটে পরম শ্রদ্ধেয় আইভি ভাবী ২১ শে আগস্ট ২০০৪ইং

0
107
স্মৃতি পটে পরম শ্রদ্ধেয় আইভি ভাবী ২১ শে আগস্ট ২০০৪ইং

লুৎফর রহমান

সকাল ১১.০০ টা ২১ শে আগস্ট ২০০৪ আমি জিল্লু ভাই এর গুলশানের বাসায় যাই। সেখানে দেখতে পেলাম মেঝেতে বসে ভাবী তার স্বামী অর্থাৎ জিল্লু ভাই এরসমস্ত ওষুধ পত্রাদি গুছাচ্ছেন। আমাকে দেখে ভাবী বললো ফুলু একটু বসো, আমি তোমার ভাই এর দৈনন্দিন ওষুধ গুলি গুছিয়ে তোমার সাথে কথা বলবো।জিল্লু ভাই তখন ভাবীর সামনেই সোফাতে বসা ছিল আমাকে জিল্লু ভাই বললো আমার পাশে বসো। ওষুধ পত্র গুছিয়ে ভাবী বললো, ফুলু তুমি তোমার ভাই এর সাথে গল্প করো, আমি চট করে গোসল সেরে আসি, কারণ ঐ দিন বিকাল বেলা ৩.০০ টা আমার আওয়ামী লীগ অফিসে যাবো সন্ত্রাস বিরোধী জনসভায় যোগ দিতে, ঐ সভায় আওয়ামী লীগে সভা নেত্রী শেখ হাসিনা সভাপতিত্ব করবেন। এর মধ্যেই জিল্লু ভাই এর সাথে বাংলাদেশের রাজনীতির প্রেক্ষাপট বিশেষ করে ভৈরবের রাজনীতির হাল চাল আলাপ মশগুল ছিলাম। ভাবী গোসল করে আসার পর আমি বললাম আমি এখন যাই। কারণ ১২.৩০ মি. বেজে গেছে। আমি ৩.০০ টার মধ্য আওয়ামী লীগের অফিসের সামনে আপনাদের জন্য অপেক্ষা করবো।জিল্লু ভাই বললো ঠিক আছে সময় মত মিটিং এ চলে যেও। কিন্তু ভাবী বাধ সাধলো, উনি বললো না ফুলু মিটিং এ যাবে না, সে যাবে বিকালে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে যেখানে আমাদের লতিফ, অর্থাৎ গৃহকোণের সম্পাদক ঐবধৎঃ এর সমস্যা নিয়ে ঐ হাসপাতালের ঊসবৎমবহপু তে ভর্তি আছে। আমরা জনসভা শেষ করে তাকে দেখতে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে যাবো। সেখানে ফুলু আমাদের জন্য অপেক্ষা করবে। আমি ভাবীর নির্দেশে লতিফ কে দেখতে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে গিয়ে দেখি লতিফ ঊসবৎমবহপু এর এ ইবফ অচেতনহীন ভাবে পড়ে আছে। বিকাল ৫.০০ টার দিকে আমি লতিফের বউ এবং ছেলেকে বলে আসলাম যে দেরি হলেও জিল্লু ভাই ও ভাবী লতিফকে দেখতে হাসপাতালে আসবে। এ ব্যাপারে আমি ডিওটিরত ডাক্তারকে উনাদের আসার কথা বলে আসি। আমি বাসায় যাওয়ার সময় পথি মধ্যে আমার চযড়হব বেজে উঠলো দেখি একটি অপরিচিত নাম্বার তাই আমি টেলি ফোনটি রিসিভ করি নাই। বার বার টেলিফোন আসাতে আমি ঞবষবঢ়যড়হব রিসিভ করলাম। দেখি একজন ব্যক্তি বললো ফুলু, আমি তোমার জিল্লু ভাই। আমাদের জনসভাতে গোলাগুলি হয়েছে, আমি রমনা ভবন থেকে বলছি তুমি শ্রীঘ্রই তোমার ভাবীর খোঁজ নেও। তাকে আমি খোঁজে পাচ্ছি না। সাথে সাথে আমি কিংকর্তব্য বিম্বর হয়ে গেলাম। এ খবর পেয়ে আমি আমার ছেলে সচিব কে নিয়ে সোজা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাই, ইতিমধ্যে আমাদের লিটন আমাকে ফোনে বললো ভাবী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ঊসবৎমবহপু তে আছে, আমি গিয়ে দেখি ভাবীর দেহটা একটি ট্রেচারের উপর নিথর ভাবে পড়ে আছে, বাকশক্তি নেই তাকিয়ে আছে আর সমস্ত শরীর থেকে রক্ত ঝড়ছে। ডা. জালাল মহিউদ্দিন ভাই বললো রক্ত লাগবে আমার রক্তের গ্র“প ভাবীর রক্তের গ্র“প এক হওয়ায় আমি তেরেচরের বাচ্চুকে নিয়ে ইষড়ড়ফ ইধহশ গিয়ে এক ব্যাগ রক্ত নিয়ে ডা. জালাল মহিউদ্দিন ভাই কে দিলাম। ইতিমধ্যে পাপন তার স্ত্রী কে নিয়ে হাসপাতালে হাজির হয়ে বার বার বললো আমি এসে গেছি আম্মা, তুমি কোন চিন্তা করো না, কিন্তু ভাবীর কাছ হইতে কোন সারা শব্দ আসে নাই। সিদ্ধান্ত হলো ভাবীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করবে। সে মতে রাতেই ঢাকা সি.এম.এইচ হাসপাতালে ভর্তি করানো হলো। ২২ তারিখ বিকাল বেলা জিল্লু ভাই কে নিয়ে হাসপাতালে যাই এবং পরের দিন ২৩ তারিখে বিকাল ৪.০০ টায় আমরা পুনরায় যাই। সেখানে আমাদের ভাগ্নে শেখ হাসিনার নিরাপত্তা কর্মকর্তা জেনারেল তারিক ই সিদ্দিক ও ভর্তি ছিল। ২৪ তারিখ রাত ২.৩০ মিনিটে পাপন আমাকে ফোনে জানালো আম্মা আর নেই। আমি তাড়া হুড়া করে গুলশান যাই। গিয়ে দেখি সবাই হাউ মাউ করে কান্না কাটি করতেছে। সকাল বেলা অহিদ চাচা ও গৃহকোণ সম্পাদক এম.এ লতিফ এর ছেলে পরশ এসে অঝোরে কান্না কাটি করছে। তৎকালিন সরকারের সিদ্ধান্ত হলো ভৈরবে লাশ দেবে না ঢাকাতেই দাফন করতে হবে। সে মতে দুপুরের দিকে সামরিক হাসপাতাল থেকে ভাবীর লাশ গুলশানের বাসায় আনা হলো। তখন আমরা নিজেরা, পাপন, তানিয়া, তনিমা ও তন্নী (পাপনের মেয়ে) সবই কান্নাকাটি করতেছি। এমন সময় জিল্লু ভাই এর কান্নাকাটি আমরা সবাই শুনতে পাই কিন্তু কান্না আর থামাতে পারছি না। ঐ দিন আমাদের বাড়ীর বড় আবু, ছোট আবু কে দেখলাম লাশ ছুয়ে উচ্চস্বরে কান্নাকাটি আরম্ভ করছে। কেউ তাহাকে থামাতে পারে নাই। সিদ্ধান্ত হলো বায়তুল মোকারম মসজিদে বাদ আসর জানাযা ও গুলশানের কবরস্থানে দাফন করা হবে। বলে রাখা ভালো, ভাবীব কবরস্থানটি বরাদ্দ ছিলো বি.এন.পির স্বাস্থ্য মন্ত্রী কামাল ইবনে ইউসুফের মায়ের নামে। যা হউক আমি রৌজ মিয়া, পাপন,জিল্লু ভাই কে নিয়ে জানাযার জন্য ভাবীর লাশ নিয়ে বায়তুল মোকারম মসজিদে রওনা হই। ঐ দিন প্রচন্ড বৃষ্টি ছিল। বাদ আসর জানাযার পর পুনরায় আমি রৌজ মিয়া, পাপন, জিল্লু ভাইকে নিয়ে একি গাড়িতে গুলশান কবরস্থানে যাই। মাগরিবের পূর্ব মুহুর্তে আমরা ভাবীর লাশ কবরে রাখি এবং আস্তে আস্তে সবাই জিল্লু ভাই সহ ভাবীকে দাফন করে গুলশানের বাসায় ফিরে আসি। উলে­খ্য যে জিল্লু ভাই তার সারা জীবনের অনুপ্রেরনাকারী স্ত্রী আইভি ভাবীকে পাপন তার আদরের মাকে এবং আমরা আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় ভাবীকে কবরে রেখে আমাদের মনের অবস্থা কি হতে পারে তা একমাত্র আল­াহ ছাড়া পৃথিবীর কেহ জানে না। আল­াহ ভাবীকে বেহশত বাসী করুক এবং কবরে তার আত্মার শান্তির জন্য কায়োমনে বাক্যে দোয়া করি, আল­াহ যেনো আমাদের দোয়া কবুল করেন, আমিন।
লেখক : অধ্যাপক লুৎফর রহমান, প্রয়াত মহামান্য রাষ্ট্রপতি আলহাজ্ব মো. জিল্লুর রহমানের সহকারী একান্ত সচিব ও সাবেক স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন!
এখানে আপনার নাম লিখুন