পানি সম্পদের অপচয় রোধ করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

0
24
পানি সম্পদের অপচয় রোধ করার আহ্বান  প্রধানমন্ত্রীর


গৃহকোণ প্রতিবেদক :
পানি সম্পদের অপচয় রোধ করতে দেশবাসীকে আহ্বান  জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল সোমবার বেলা ১১টার দিকে বিশ্ব পানি দিবস ২০২২ উদযাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত থেকে তিনি এ আহ্বান  জানান। শেখ হাসিনা বলেন, ঢাকা শহরসহ বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশন, উপজেলা পর্যায়ে আমরা পাইপের মাধ্যমে পানি পরিশুদ্ধ করে সরবরাহ করার ব্যবস্থা নিয়েছি। এগুলো করতে অনেক খরচ হয়। তাই পানির অপচয় বন্ধ করতে হবে। সেটা নির্মাণ কাজ, গাড়ি ধোয়ার কাজ, গৃহস্থালি, রান্না বা যেকোনো কাজেই ব্যবহার করা হোক। সব ক্ষেত্রে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। তিনি বলেন, এ পানিসম্পদ অপচয় করলে শেষ পর্যন্ত কোনো সম্পদই থাকে না। কাজেই আমাদের এ অমূল্য সম্পদ আমরা কিভাবে সংরক্ষণ করে ব্যবহার করতে পারি, ভবিষ্যৎ বংশধর ব্যবহার করতে পারে সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বৃষ্টির পানি যেন ভ‚-গর্ভে চলে যেতে পারে, তাতে ভ‚গর্ভস্থ পানি পুনর্ব্যবহার হবে, সেদিকে দৃষ্টি রেখে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সব জায়গা আমরা সিমেন্ট দিয়ে ঢেকে দিলাম, আর বৃষ্টির পানি গড়িয়ে চলে গেল সেটা না, আবার বৃষ্টির পানি সব যে নদীতে পড়বে তাও নয়। আমাদের আশপাশের জলাধারে যেন বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ থাকে, যেতে পারে, সেই ব্যবস্থাটাও আমাদের নিতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, বাংলাদেশের ভ‚প্রকৃতি অবস্থা, ভৌগোলিক অবস্থান সবকিছু বিবেচনা করেই আমরা বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করে থাকি। কারণ এদেশ আমাদের, মাটি ও মানুষ আমাদের। তাদের কল্যাণ এবং মঙ্গল কিসে হয়, শুধু আজকের জন্যই নয় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এ দেশ যেন উন্নত এবং সমৃদ্ধ থাকে। বঙ্গবন্ধুকন্যা আরও বলেন, পানির অপর নাম জীবন, কাজেই পানি সম্পদকে রক্ষা করা আমাদের একান্তভাবে প্রয়োজন। ভ‚গর্ভস্থ পানি যত কম ব্যবহার করা যায়, ভ‚-উপরিস্থ পানি যত বেশি ব্যবহার করা যায়, সেদিকে লক্ষ্য রেখেই আমরা নিজেরা সমস্ত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। ভবিষ্যতেও যখন বিভিন্ন প্রকল্প প্রণয়ন করা হয়, এ বিষয়টি বিশেষভাবে দৃষ্টি রাখবেন বলে আমি বিশ্বাস করি। তিনি আরও বলেন, যখনই কোনো নগরায়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে, কোনো ভবন বা বাসস্থান নির্মাণ করা হবে, সবক্ষেত্রেই আমাদের দুটো বিষয় খেয়াল রাখতে হবে। একটা হচ্ছে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা, আরেকটা হচ্ছে জলাধার থাকা। জলাধার থাকা একান্ত ভাবে প্রয়োজন। সেখানেও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ হয়। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং ব্যবহারে আমাদের বিশেষভাবে জোর দিতে হবে এবং সেভাবেই আমাদের কাজ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের যে বিশাল পানিসম্পদ রয়েছে, তা যদি যথাযথ ব্যবহার করতে পারি, তবে বিশ্বকে পানি সরবরাহ করতে পারব আমরা। শেখ হাসিনা বলেন, স্বাধীনতার পরপরই যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে গড়ে তোলার পদক্ষেপ নেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেই সঙ্গে বাংলাদেশ যে একটা ব-দ্বীপ, সে কথা মাথায় রেখে তিনি এ দেশে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পানিসম্পদ রক্ষা ও ব্যবহার বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেন। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং যৌথ নদী কমিশন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতার পথ অনুসরণ করেই আওয়ামী লীগ ১৯৯৯ সালে জাতীয় পানি নীতি প্রণয়ন করে। দ্বিতীয়বার যখন আমরা সরকারে আসি, তখন জাতীয় পানি ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনা প্রণয়ন করি। বাংলাদেশ পানি আইন ২০১৩, বাংলাদেশ পানি বিধিমালা ২০১৮ প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়ন করছি। তাছাড়া জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন পর্যায়ে সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা গাইডলাইনও জারি করা হয়েছে। সরকার প্রধান আরও বলেন, এ বছর বিশ্ব পানি দিবসের প্রতিপাদ্য ‘ভ‚গর্ভস্থ পানি: অদৃশ্যকে দৃশ্যমান করা’। যা ভ‚গর্ভস্থ পানি সুরক্ষা, টেকসই ব্যবহার, সমন্বিত ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করছে। আমরা প্রকৃতপক্ষে মিঠা পানির দেশ। জাতিসংঘ ঘোষিত এসডিজি-৬ বাস্তবায়নে আমাদের বিশেষ দৃষ্টি রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য সুপেয় পানির ব্যবস্থা এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এসডিজি-৬-এর সব থেকে বড় লক্ষ্য। ইতোমধ্যে স্যানিটেশনে আমরা ৯৭ শতাংশ সফলতা অর্জন করেছি। সুপেয় পানি ব্যবস্থার জন্যও আমরা বিভিন্ন পদক্ষেপ হাতে নিয়েছি। তিনি আরও বলেন, পৃথিবীর অনেক দেশ আছে, যেখানে সুপেয় পানি পাওয়া কষ্টকর। তারা অনেক কষ্ট করছে। কিন্তু আমাদের বিশাল পানিসম্পদ রয়েছে। আমরা যদি আমাদের এই সম্পদ যথাযথ ব্যবহার করতে পারি, তাহলে আমাদের দেশের মানুষের কোনদিন কষ্ট হবে না। বরং আমরা বিশ্বকে পানি সরবরাহ করতে পারব। সে বিষয়টা মাথায় রেখেই আমাদের কাজ করতে হবে।তিনি বলেন, বিভিন্ন সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে আমরা পানি ব্যবহার করে থাকি। ভ‚গর্ভস্থ পানির উপরে এখনও যথেষ্ট নির্ভরশীলতা রয়েছে। ঢাকা শহরে আমরা নদীর পানি পরিশুদ্ধ করে সরবরাহ করা শুরু করেছি। ঠিক সেভাবেই জেলা উপজেলাতেও পাইপের মাধ্যমে সুপেয় পানি দেওয়ার ব্যবস্থা নিয়েছি, সেটাও কিন্তু নদীর পানি পরিশুদ্ধ করে দিচ্ছি। ভ‚গর্ভস্থ পানি ব্যবহার সীমিত করার বিভিন্ন পদক্ষেপ ইতোমধ্যে আমরা হাতে নিয়েছি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার দেশের সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে প্রকৃতি ভিত্তিক সমাধানকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তিনি বলেন, উন্নয়ন দর্শনের ক্ষেত্রে আমরা প্রকৃতি ভিত্তিক সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছি। পানি সম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনার জন্যে আমাদেরকে প্রকৃতি ভিত্তিক কৌশল খুঁজে বের করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট সকলকে খাল, বিল, হাওর ও বাওড়ের সাথে নদীর সংযোগবিন্দু সমূহ খুলে দেয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেন তা না হলে নদীর নাব্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি এ সকল বিষয় বিবেচনায় নিয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বরোপ করেন। শেখ হাসিনা নদী খননের সময় নাব্যতা সৃষ্টির পাশাপাশি অতিরিক্ত পানি কিংবা বন্যার পানি সংরক্ষণে বাফার জোন তৈরির ওপরও গুরুত্বারোপ করে বলেন, এই পানি শীতকালে চাষাবাসে ব্যবহার করা যেতে পারে। তিনি বলেন, বন্যার সঙ্গে কিভাবে বাঁচতে হয়, সম্পর্ক গড়ে তুলতে হয় সে সম্পর্কে আমাদের জানতে হবে। কারণ, বাংলাদেশ একটি দুর্যোগপ্রবণ দেশ। প্রধানমন্ত্রী সড়ক কিংবা বেড়িবাঁধ নির্মাণের প্রকল্প নেয়ার সময়ে গাছের চারা লাগানোরও নির্দেশ দেন কারণ এ পদক্ষেপ ভ‚মিধস থেকে রক্ষায় সহায়ক হবে। তিনি সকলকে ভ‚গর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমানোরও নির্দেশ দেন। কারণ, ভ‚গর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার ঘন ঘন ভ‚মিকম্পের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে। আর বাংলাদেশকে ভ‚মিকম্পপ্রবণ দেশ হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। শেখ হাসিনা বলেন, সরকার ভ‚গর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমাতে নদীর পানি বিশুদ্ধ করে জনগণের কাছে নিরাপদ পানি সরবরাহ এবং সেচকাজে ভ‚পৃষ্ঠের পানি ব্যবহারসহ নানা পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছে। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন- পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী একেএম এনামুল হক শামীম। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কবির বিন আনোয়ার। অনুষ্ঠানে বিশ্ব পানি দিবসের ওপর একটি অডিও-ভিডিও গান এবং বাংলাদেশের পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিষয়ক একটি ডকুমেন্টরি প্রদর্শিত হয়। এবারের বিশ্ব পানি দিবসের প্রতিপাদ্য, ‘গ্রাউন্ডওয়াটার-মেকিং দি ইনভিজিবল ভিজিবল।’ বিশুদ্ধ পানির গুরুত্বের প্রতি মনোযোগ কেন্দ্রীভ‚ত এবং বিশুদ্ধ পানি সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনার সুপারিশের লক্ষে প্রতিবছর ২২ মার্চ বিশ্ব পানি দিবস পালিত হয়। জাতিসংঘের পরিবেশ ও উন্নয়ন বিষয়ক সম্মেলনের (ইউএনসিইডি) সুপারিশের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের গৃহীত প্রস্তাব অনুযায়ী ২২ মার্চ ওয়ার্ল্ড ডে ফর ওয়াটার ঘোষণা করা হয়, যা ১৯৯৩ সাল থেকে পালিত হয়ে আসছে।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন!
এখানে আপনার নাম লিখুন