স্বল্পোন্নত-উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বিনামূল্যে ভ্যাকসিন দেয়ার আহবান জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

0
72
স্বল্পোন্নত-উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বিনামূল্যে ভ্যাকসিন দেয়ার আহবান জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

গৃহকোণ প্রতিবেদক \ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, করোনা মহামারি বহুমুখী বৈশ্বিক সমস্যা তৈরি করেছে এবং বৈশ্বিকভাবেই এটির সমাধান করা দরকার। এই সঙ্কট মোকাবিলার জন্য একটি সু-সমন্বিত রোডম্যাপ প্রয়োজন। রাজস্ব প্রণোদনা, কনসেশনাল আর্থিক সহায়তা এবং ঋণের মাত্রা কমানোর মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত এলডিসি এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বেইল আউটের হাত থেকে রক্ষার জন্য জি-৭, জি-২০, ওইসিডি দেশগুলো, বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করতে হবে। উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোকে অবশ্যই উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রতিশ্রæত, অথচ অদ্যাবধি অপূরণকৃত কোটামুক্ত বাজার সুবিধা এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে হবে। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় আসেম (দ্য এশিয়া-ইউরোপ মিটিং) অর্থমন্ত্রী পর্যায়ের ১৪তম সভায় ভিডিও বার্তায় এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। করোনার কারণে ভার্চুয়ালি আয়োজিত এবারের সভার আয়োজক বাংলাদেশ। এতে সভাপতিত্ব করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। ভিডিওবার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা আশা করি বিশ্ব শিগগিরই কোভিড -১৯ এর বিরুদ্ধে কার্যকর ভ্যাকসিন পেতে যাচ্ছে। বিশ্বের সকল দেশের জন্য বিশেষত এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) এবং উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই ভ্যাকসিন বিনামূল্যে পাওয়ার ব্যবস্থা করতে আমি আহŸান জানাচ্ছি। উন্নত দেশগুলো, এমডিবি এবং আইএফআইএস এ ক্ষেত্রে উদার সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে আসবে বলে আমরা প্রত্যাশা করছি। আমরা অতীতে শিখেছি যে, বিচ্ছিন্নতা নয় বরং সহযোগিতা যেকোনো সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করতে পারে। তিনি আরও বলেন, এ বছর চতুর্দশ আসেম অর্থমন্ত্রী সভার আয়োজন করতে পেরে বাংলাদেশ অত্যন্ত আনন্দিত। এই অনুষ্ঠানে যোগদান করায় আমি আপনাদের সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমাদের মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যিনি একটি বৈষম্যহীন, সুখী ও সমৃদ্ধশালী দেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, আমি তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। আমি অত্যন্ত খুশি যে, এ সঙ্কটময় সময়ে আপনারা বিন¤্র চিত্তে এবং সহমর্মিতা প্রদর্শনপূর্বক এ সভায় যোগ দিয়েছেন। প্রসঙ্গত, অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে এমন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, আর্থিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে এশীয় ও ইউরোপীয় জাতিসমূহের জন্য আসেম হচ্ছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। অংশীদার দেশগুলোর জন্য গুরুত্ব বহন করে এমন অভিন্ন অর্থনৈতিক ও আর্থিক বিষয়াদি চতুর্দশ আসেম অর্থমন্ত্রী সভায় উঠে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা বলেন, করোনায় সকল দেশের স্বাস্থ্য-ব্যবস্থা এবং অর্থনীতিতে ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছে। বিশ্ব অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; জনগণের বেশিরভাগই আয় হ্রাস এবং চাকরি হারানোর সম্মুখীন হয়েছে। দারিদ্র্য পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে এবং স্বাস্থ্য খাত কঠিন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। অধিকাংশ দেশেই টেকসই উন্নয়ন অভিষ্টের সূচকসমূহের অর্জন ও কষ্টার্জিত সমৃদ্ধি এখন হুমকির সম্মুখীন। স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশসমূহ এ মহামারির কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাংলাদেশ গত এক দশক ধরে অব্যাহতভাবে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে এবং আর্থ-সামাজিক সূচকেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ২০৩১ সালের মধ্যে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উন্নত দেশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে আমরা ‘‘ভিশন ২০৪১’’ গ্রহণ করেছি। এসডিজি অর্জনের ক্ষেত্রে আমাদের দেশ ভালো অবস্থানে ছিল। তবে করোনাভাইরাসের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে আমাদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা সত্তে¡ও এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য সুবিশাল প্রণোদনা প্যাকেজ গ্রহণ করা সত্তে¡ও এ মহামারি আমাদের অগ্রযাত্রার ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। আমার সরকার এখন পর্যন্ত অর্থনীতির বিভিন্ন সেক্টরের পাশাপাশি আমাদের সমাজের বিভিন্ন খাতকে সহায়তা করার জন্য ১৪ দশমিক ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমতুল্য ২১টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এই সহায়তা প্যাকেজের পরিমাণ জিডিপির ৪ দশমিক ৩ শতাংশের সমান। কয়েক মাসব্যাপী মহামারির প্রাথমিক ধাক্কা সামলানোর পর আমাদের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। রফতানি, প্রবাস আয়, কৃষি উৎপাদন ইত্যাদি ক্ষেত্রে সর্বশেষ প্রবণতাই এটি নির্দেশ করে যে, আমাদের অর্থনীতি এখন টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে পুনরায় ফিরে আসছে। আমি আশা করি যে, চতুর্দশ আসেম অর্থমন্ত্রী সভা ঈপ্সিত ফলাফল অর্জন করবে, যা সদস্য দেশসমূহের জন্য উপকার বয়ে আনবে, এই বলে সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নেন প্রধানমন্ত্রী।
১৪তম আসেম (দ্য এশিয়া-ইউরোপ মিটিং) অর্থমন্ত্রী সভায় বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী এ এইচ এম মুস্তফা কামাল বলেন, আপনারা ইতোমধ্যে শুনেছেন যে, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যদি কোনো ভ্যাকসিন আসে বাংলাদেশে আসতে হবে। বাংলাদেশের জনসংখ্যার ভিত্তিতে ভ্যাকসিন আসবে। এখানে অসমতার ভিত্তিতে কিছু হতে পারবে না। তার দাবি হচ্ছে, সারাবিশ্বের যারা ধনী স¤প্রদায় তারা এর খরচ বহন করবে। এটা তিনি দাবি করেছেন। আমি মনে করি, এটা অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত। সারাবিশ্বের মাঝে অধিকাংশই তার দাবির পক্ষে মতামত প্রকাশ করেছেন সুতরাং আমাদের অবস্থান হচ্ছে ফ্ল্যাক্সিবল (নমনীয়), যখন যেটা হবে তখন সেটা দেখা যাবে। এশিয়া ও ইউরোপের দেশগুলোর অর্থমন্ত্রীরা কী আলোচনা করলেন তা তুলে ধরে মুস্তফা কামাল বলেন, আপনারা সবাই জানেন, আজকের সভাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এশিয়া ও ইউরোপ – এই দুইয়ের মাঝে একটা গেটওয়ে আসেম। আজকের সভার থিম ছিল করোনা মোকাবিলা। শক্তিশালী টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ভারসাম্যপূর্ণ পুনর্গঠন নিশ্চিত করা। শুধু করোনা নয়, এটি চলে গেলে দেশের অর্থনীতিকে ঘিরে সামাজিক স্তর, বিভিন্ন স্তরের যে ক্ষতবিক্ষত অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, এসব বিষয় আলোচিত হয়েছে। এখন সবার অবস্থা একরকম না। কোনো কোনো দেশের অবস্থা ভালো আছে। আমরাও ভালো আছি। কিন্তু অন্যান্য দেশের অবস্থা খুবই খারাপ। এগুলো অতি দ্রæত সময়ের মধ্যে মোকাবিলা করা দরকার। যত দেরি হবে, ততই সমস্যা বেড়ে যাবে। আজকের সভায় উঠে এসেছে যে, সবাই চেষ্টা করবে কত দ্রæত এই জাতীয় সমস্যাগুলোকে সমাধান করতে পারি। আমাদের অর্থনীতিকে স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারি। এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, সভায় অংশগ্রহণকারী সবার অবজেক্টিভ একটাই, নিজে বাঁচো অন্যকে বাঁচাও। আগে নিজেরা বাঁচতো, অন্যান্যের কথা ভাবতো না। কিন্তু এখন সবাই মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে, নিজে ভালোভাবে বাঁচতে হলে অন্যকে বাঁচাতে হবে। সেই প্রতিপাদ্য বিষয়টিকে আরও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। গতকাল শুক্রবার ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত ১৪তম আসেম অর্থমন্ত্রী সভায় অংশগ্রহণ শেষে সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। এবারের সভার আয়োজন করে বাংলাদেশ। করোনার কারণে ভার্চুয়ালি আয়োজিত এ সভায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সভায় ভিডিও বক্তৃতার মাধ্যমে সবাইকে স্বাগত জানান। অর্থমন্ত্রী মুস্তফা কামাল এ সভায় সভাপতিত্ব করেন। এ সভায় এশিয়া ও ইউরোপের ৪৫টি আসেম অংশীদার দেশের অর্থমন্ত্রী ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা এবং এশিয়া-ইউরোপ ফাউন্ডেশন (আসেফ) ও আশিয়ান+৩ ম্যাক্রোইকোনমিক রিসার্চ অফিস (আমরো) অংশগ্রহণ করেন। বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের প্রতিনিধিরা মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। এ সভার মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘কোভিড-১৯ মোকাবিলা : একটি শক্তিশালী, টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক পুনর্গঠন নিশ্চিতকরণ’।

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন!
এখানে আপনার নাম লিখুন